বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ০৫:৪৩ অপরাহ্ন
সমর বিশেষ প্রতিবেদক:
চেঙ্গী নদীর পানির প্রবাহ কমে গেলে সংকটে পড়বে কাপ্তাই হ্রদ। কাপ্তাই বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা।
পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ির প্রাণ বলা হয় চেঙ্গী নদীকে। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে আসা এই নদী শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়, এখানকার মানুষের সংস্কৃতি, অর্থনীতি ও জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই নদীতে ফুল ভাসিয়ে নিজেদের বর্ষবরণ আয়োজন শুরু করে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠী।দেশের অন্যান্য নদীর মতো পাহাড়ি এই নদীতে চোখ পড়েছে দখলদারদের। জেলা সদরসহ বিভিন্ন স্থানে নদীর জায়গা দখল করে ঘরবাড়ি, দোকানপাট করেছেন লোকজন। তাঁদের অনেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নদীভাঙনের শিকার হয়ে এখানে ঠাঁই নিয়েছেন। করেছেন বসতঘর আবার নদীতে দেওয়া হয়েছে রাবার ড্যাম। শুষ্ক মৌসুমে কৃষিকাজের জন্য পানি প্রত্যাহারে অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয় নদীর বিভিন্ন জায়গায়। পলি জমে নিয়মিত ভরাট হচ্ছে নদী। কমছে গভীরতা। হ্রাস পেয়েছে পানির ধারণ ক্ষমতাও। বর্ষাকালে বন্যার সময় ভাঙনের তীব্রতাও বেড়েছে আগের তুলনায় অনেক বেশি। নদীর ওপর অত্যাচার এখানে থেমে নেই। দখল ও ভাঙনের পাশাপাশি দূষণও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নদীর খনন এবং ভাঙন রোধে একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও মাঝপথে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
জেলার প্রধান নদীর মতো শহরের প্রধান খালও দখল দূষণের কবলে পড়ে বিপর্যস্ত। খাগড়াছড়ি খাল নামের এই খালের জায়গা দখল করে বিপণি বিতান, আবাসিক ভবন, হোটেলসহ বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করেছে স্থানীয় প্রভাবশালী ও সরকারি প্রতিষ্ঠান। তাঁদের অবকাঠামোর কারণে খাল সংকুচিত হয়েছে। পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বৃষ্টি হলেই শহরে জলজট সৃষ্টি হয়।
প্রধান নদী ও খালের ওপর এমন অত্যাচারের প্রতিদান দিতে শুরু করেছে প্রকৃতি। পাহাড়ি জনপদে গত বছর স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা হয়। জেলা শহরসহ আশপাশের উপজেলাগুলোও পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।
শুধু চেঙ্গী নদী নয়, দখল হচ্ছে খাগড়াছড়ি শহরের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম খাগড়াছড়ি খালও। বিপণি বিতানের প্রতিরোধ দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে খালের জায়গায়।
নদী-খাল নিয়ে এমন অবহেলা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন নদী গবেষকেরা। তাঁদের মতে, চেঙ্গী দেশের সবচেয়ে বড় হ্রদ কাপ্তাই হ্রদেরও পানির অন্যতম উৎস। চেঙ্গী নদী থেকে পানি না এলে কাপ্তাই হ্রদের মৎস্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই নদী রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
চেঙ্গীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব
চাকমা ভাষায় চেঙ্গী বা চেঙেই হচ্ছে এক প্রকার ছোট আকারের বিশেষ উদ্ভিদ, যা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। পাহাড়ি জনপদের মানুষের সঙ্গে এই নদী জড়িয়ে আছে সুদীর্ঘকাল থেকে। ২২৭ বছর আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে চট্টগ্রামে মসলা চাষ সম্ভব কি না, সেটি যাচাই করতে এসেছিলেন ফ্রান্সিস বুকানন। তখন তিনি চট্টগ্রামসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলও ভ্রমণ করেছিলেন।
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় ফ্রান্সিস বুকানন বইয়ে ফ্রান্সিস বুকানন চেঙ্গীকে চিমি বা চিংগি উল্লেখ করেছিলেন। ১৭৯৮ সালের ২৯ এপ্রিল তিনি চেঙ্গী নদীতে আসেন। তিনি লিখেছেন, চেঙ্গীর দুধারে চাকমারা বসবাস করতেন। চেঙ্গী ধরে উজানে গেলে অনেকগুলো ছোট নদী দেখেছিলেন বুকানন। নদীগুলোর নামও লিপিবদ্ধ করেছিলেন তিনি।
গবেষক সুগত চাকমার মতে, পাহাড়ি জনপদের বিশেষ করে খাগড়াছড়ির মানুষের জন্য চেঙ্গী নদী গুরুত্বপূর্ণ। তিনি খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার চাকমাদের আর্থসামাজিক অবস্থা বইয়ে উল্লেখ করেছেন,
খাগড়াছড়ি জেলার ইতিহাস, বিভিন্ন উপজাতীয় পূর্বপুরুষদের বসতি স্থাপন, জুম ও জমিতে লাঙ্গল/হাল দিয়ে চাষাবাদকরণে এসবের ক্ষেত্রে চেঙ্গী, মাইনী ও ফেনী নদীসহ অপরাপর ছোট–বড় সব নদীগুলোর অশেষ অবদান রয়েছে।”
৪০ জায়গায় ভাঙছে নদী, মৃতপ্রায় ছড়া-খালও
দেশের অবৈধ দখলদারত্ব এবং দূষণ থেকে রক্ষা এবং নদীর তথ্যভান্ডার তৈরির জন্য ২০২২ সালে সমীক্ষা করেছিল জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন। এর আওতায় ৪৮টি নদী ছিল। একটি ছিল চেঙ্গী নদী।
ওই সমীক্ষায় চেঙ্গী নদীর ভাঙনপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়। নদীর অন্তত ৪০টি জায়গায় তীব্র ভাঙন হয়। এসব স্থান প্রায় প্রতিবছরই ভাঙে। দফায় দফায় ভাঙনের কারণে ৫ বছরে নদীর ১২ হাজার ৩৮০ মিটার জায়গায় ভেঙেছে।
সবচেয়ে বেশি ভাঙনের ঘটনা ঘটে খাগড়াছড়ি সদর উপজেলায়। এই উপজেলার ২০টি স্থানে প্রতিবছর নিয়ম করে ভাঙে নদী। সদর উপজেলার গোলাবাড়ি ও ভাইবোন ছড়া ইউনিয়নে প্রতিবছর ভাঙছে নদী
বারবার নদীভাঙনের কারণে কৃষিজমির ক্ষতি হচ্ছে বেশি। নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে মানুষের জায়গাজমি। অনেকের চাষের জমিও নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর বন্যার সময় তীব্র স্রোতের কারণে স্থানীয় রাস্তাঘাটও ভেঙে যাচ্ছে।
চেঙ্গী নদীর সঙ্গে যুক্ত আছে ১০০ খাল ও ছড়া। এসব ছড়ার মধ্যে ৯টির প্রবেশমুখ বন্ধ হয়ে গেছে। প্রবাহ নেই ৩টিতে। নিয়মিত ভাঙন হচ্ছে ২৪টিতে। আংশিক ভরাট হয়েছে ৪টি ছড়া ও খাল। শুষ্ক মৌসুমে কার্যত মৃত থাকে ২৪ ছড়া-খাল।
খাগড়াছড়ি জেলার পাহাড়ি খরস্রোতা চেঙ্গী, মাইনী ও অন্যান্য নদী-ছড়ার ভাঙন থেকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় এবং খননের জন্য খাগড়াছড়ি শহর ও তৎসংলগ্ন অবকাঠামো নদীভাঙন থেকে সংরক্ষণ শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৫৮৬ কোটি টাকার এই প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩২ শতাংশ।
চেঙ্গী নদী নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন রাঙামাটি জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে দেওয়া চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে নৌপথে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। নদীর নাব্যতা রক্ষার জন্য খনন এবং নদী শাসন করার অনুরোধ জানান তিনি। এ ছাড়া পানিপ্রবাহ ঠিক রাখার জন্য নদীর উৎসমুখগুলো ছড়া, ঝিরি, নালা খনন করা যেতে পারে বলে মতদিয়েছিলেন।
আপনার মন্তব্য লিখুন