বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৬ পূর্বাহ্ন
কাজী নাসের:
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে খোলস পালটে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে কিশোর গ্যাংগুলো। চট্টগ্রাম, রাজশাহী, কুমিল্লা ও খুলনায় খুন, ছিনতাই, মাদক ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধের বড় অংশই এখন তাদের নিয়ন্ত্রণে। আগে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের ছত্রছায়ায় থাকা এসব গ্যাংয়ের অনেকেই এখন কথিত ‘বড়ভাই’র ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বেশ কয়েকজন গ্যাং সদস্য গ্রেফতার হলেও মূল গডফাদাররা এখনো অধরা। পুলিশ বলছে, ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রামে ফের দাপট
তালিকা করেও নিয়ন্ত্রণে হিমশিম সিএমপি
চট্টগ্রামে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ‘কিশোর গ্যাং’। প্রতিদিনই নগরীর কোথাও না কোথাও ঘটছে নানা অঘটন। খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অপহরণসহ নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা তৎপরতার পরও তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। পুলিশ ও স্থানীয়দের অভিযোগ, কথিত ‘বড় ভাইদের’ শেল্টারেই কিশোররা অপরাধে জড়াচ্ছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাং-এর হাতে ৩৯টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। অন্যান্য অপরাধের সংখ্যা ছয়শর বেশি। পুলিশের খাতার বাইরেও রয়েছে অসংখ্য ঘটনা। স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কথিত রাজনৈতিক বড় ভাইদের শেল্টারে যারা অপকর্ম করত, তাদের অনেকে এখন ভোল পালটেছে। কথিত বড় ভাইদের সঙ্গে তাদের চলাফেরা দেখা যাচ্ছে। তবে অপকর্মের ধরন বদলায়নি। স্থানীয়রা জানান, নগরীর ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নূর মোস্তফা টিনুর অনুসারী হিসাবে নয়ন, কামরুলসহ অনেকে কিশোর গ্যাং-এ জড়িত ছিল। এখন তাদের বাদশার অনুসারীদের মিছিল-মিটিংয়ে দেখা যায়। বাকলিয়া অ্যাক্সেস রোড এলাকায় মাদক ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে গোলাগুলির ঘটনায় ১৬ মামলার আসামি মো. মুরাদকে গ্রেফতার করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তিনি চট্টগ্রাম-১০ আসনের সাবেক সংসদ-সদস্য মহিউদ্দিন বাচ্চুর অনুসারী ও কিশোর গ্যাং লিডার হিসাবে পরিচিত ছিলেন বলে স্থানীয়রা জানান।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) হাতে কিশোর গ্যাং লিডারদের একটি তালিকা রয়েছে। তবে তালিকাভুক্তদের অধিকাংশই ধরাছোঁয়ার বাইরে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নগরীর অন্তত অর্ধশতাধিক এলাকায় কিশোর গ্যাং-এর দৌরাত্ম্য রয়েছে। সাম্প্রতিক ঘটনায় ১৫টি গ্যাং-এর নাম বেশি এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে খুলশির ৫জি ও ৭জি, চকবাজারের ৭ বয়েজ ও কিউট বয়েজ, মুরাদপুরের এমবিএস, পাঁচলাইশের কেবি, এনএস, ৯৯৯, এক্স-মার্ক, ব্যাকহোল, ডট গ্যাং, বিসু, পাইথন, সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার।
স্থানীয় সূত্র জানায়, সন্ধ্যার পর স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, চকবাজার, সিআরবি, খুলশি, ফয়েস লেক, ডেবারপার, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, সিডিএ, ছোটপুল, হালিশহর, বন্দর কলোনি ও পতেঙ্গার বিভিন্ন এলাকায় মাদক বেচাকেনা, ছিনতাই, আড্ডাসহ নানা কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে মরিয়া কিশোর গ্যাং। মেয়েদের ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল ছিনতাইয়ের অনেক ঘটনায়ও কিশোর অপরাধীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি সিএমপির ‘অপারেশন এস ড্রাইভ’ শুরু হওয়ার পর কয়েক মাসে কিশোর গ্যাং-এর কয়েকশ সক্রিয় সদস্য গ্রেফতার হয়েছে। অস্ত্র, ইয়াবাসহও ধরা পড়ছে কিশোর-যুবকরা।
৪ এপ্রিল বাকলিয়ার মিয়াখান নগরে দুই কিশোর গ্যাং-এর গোলাগুলিতে ১৩ বছরের শিশু ফাহিম দুই পায়ে গুলিবিদ্ধসহ পাঁচজন আহত হয়। পুলিশ চারজনকে গ্রেফতার করে। ৬ এপ্রিল কোতোয়ালির কোরাবানীগঞ্জ বলুয়াদিঘির পাড়ে যুবদল কর্মী মিনহাজকে কুপিয়ে কবজি বিচ্ছিন্ন করার ঘটনায়ও কিশোর গ্যাং-এর সদস্যরা জড়িত বলে পুলিশ জানায়।
১২ এপ্রিল চকবাজারের মৌসুমী আবাসিক এলাকায় দুপক্ষের সংঘর্ষে বিএএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র আশফাক কবির সাজিদ নিহত হয়। সর্বশেষ মঙ্গলবার রাতে খুলশির ওয়্যারলেস গেট এলাকায় ছুরিকাঘাতে হৃদয় নামে এক কিশোর নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় ছয় কিশোরকে গ্রেফতার করা হয়েছে।ু
সিএমপির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশীদ বলেন, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তৎপর রয়েছে। প্রতিদিনই সদস্যদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। প্রতিটি থানায় গ্রেফতারের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিভাবকদেরও সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যায়, সে বিষয়ে খোঁজখবর রাখা উচিত।
আপনার মন্তব্য লিখুন