রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৩:১৪ পূর্বাহ্ন
সিরাজ উদ্দিন মোঃ আলমগীর :
৩৬ জুলাই ছিল আমাদের ঘুনেধরা সমাজ আর রাষ্ট্র ব্যবস্হার প্রতি মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষেভের চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আমাদের ক্রীড়া ব্যবস্হায় রাজনীতিকরণ, বাক স্বাধীনতা হরন, যোগ্য ব্যক্তিদের অবমূল্যায়ন, ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামেকে দূর্বলকরন, যুগোপযোগী আধুনিক ক্রীড়া নীতি তৈরির ব্যর্থতা, ক্রীড়া শিক্ষার চর্চাকে আধুনিকায়ন করতে না পারা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অনিয়ম আর স্বজনপ্রীতি সর্বোপরি গুড গভর্নেন্স/ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে না পারার ব্যর্থতার কারনে ও ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট অনেকের মধ্যে পুঞ্জভীত ক্ষোভ ছিল। পাশাপাশি সে সব অনিয়ম আর অব্যবস্হাপনা দীর্ঘদিন ধরে আমাদেরকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে কাংখিত সাফল্য অর্জন থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে ।
বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটায় না ঘটায় সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবনধারার রূপান্তর। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ক্রীড়া হয়ে ওঠে জাতীয় পরিচয় ও ঐক্যের মাধ্যম।বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া বিপ্লব পরবর্তী সেসব দেশে ক্রীড়া ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কিছু পরিবর্তনের উদাহরণ নিম্নে তুলে ধরা হল।
১. ফরাসি বিপ্লব : ১৭৮৯ সালে অনুষ্ঠিত ফরাসি বিপ্লবের জোয়ারে ফ্রান্সে ক্রীড়া চর্চায় দীর্ঘদিনের রাজতান্ত্রিক ও অভিজাত শ্রেণির একচেটিয়া ক্রীড়া চর্চার রীতি ভেঙে যায় এবং সাধারণ জনগণের জন্য খেলাধুলাকে উন্মুক্ত করে দেয়া হয়।স্কুল ও শিক্ষাব্যবস্থায় শারীরিক শিক্ষা চালু করা হয়। জিমন্যাস্টিকস ও শারীরিক শিক্ষাকে করা হয় জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অংশ। রোপিত হয় আধুনিক ক্রীড়া সংস্কৃতির বীজ। আধুনিক ক্রীড়া ব্যবস্থার সূচনার মাধ্যমে বিপ্লব পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে বদলে যেতে শুরু করে ফরাসী ক্রীড়াঙ্গন এবং সময়ের পরিক্রমায় পৌঁছে যায় উন্নতির চরম শিখরে।
২. রুশ বিপ্লব : ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব পরবর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রীড়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ক্রীড়া নীতির প্রবর্তন করা হয়। চালু করা হয় “Sport for All” নীতি। দ্রুততম সময়ে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক ক্রীড়া স্কুল ও একাডেমি। এসবের বদৌলতেই অলিম্পিক সহ বিশ্বের বড় বড় ক্রীড়া আসর গুলোতে রাশিয়া তথা সোভিয়েত ইউনিয়ন জিমন্যাস্টিকস, ভারোত্তোলন, অ্যাথলেটিক্স সহ বিভিন্ন ইভেন্টে দীর্ঘ সময় ধরে আধিপত্য বিস্তার করে চলে চলেছে।
৩. চীনা বিপ্লব : ১৯৪৯ সালে চীনে ঘটে যাওয়া চীনা বিপ্লব পরবর্তী সেখানে ক্রীড়াকে জাতীয় শক্তি ও ঐক্যের প্রতীক হিসেবে দেখা শুরু করে। সূচনা হয় গ্রাম থেকে শহর পর্যন্ত গণক্রীড়া আন্দোলন। কেন্দ্রীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রবর্তন করা হয় রাষ্ট্রীয় প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার যার মাধ্যমে তৈরি করা হতে থাকে বিশ্বমানের ক্রীড়াবিদ। যারই ধারাবাহিকতায় চীন আজ অলিম্পিকে অন্যতম শীর্ষ দেশের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত।
৪. কিউবান বিপ্লব : কিউবান বিপ্লব (১৯৫৯) পরবর্তী কিউবাতে খেলাধুলাকে সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় ও বিনামূল্য করা হয়। প্রনয়ন করা হয় দীর্ঘমেয়াদি ক্রীড়া নীতি। সেসব নীতিমালার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ফলে কিউবা আজ বিশেষত বক্সিং, অ্যাথলেটিক্স ও বেসবলে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হয়েছে। গৃহীত ক্রীড়া বান্ধব নীতিগুলোর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের ফলশ্রুতিতে ছোট দেশ হয়েও অলিম্পিকে তারা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
৫. দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন : ১৯৯৪ সালে অনুষ্ঠিত দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের পর সে দেশে খেলাধুলা থেকে সকল প্রকার বর্ণবৈষম্য প্রথা বিলুপ্ত করা হয়। সব জাতিগোষ্ঠীর জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। ১৯৯৫ সালে রাগবিতে তাদের বিশ্বকাপ জয় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। বৈষম্য দূরীকরন সহ বিভিন্ন সংস্কারের কারনে দক্ষিণ আফ্রিকায় ক্রিকেট ও ফুটবলেও দ্রুত উন্নতি ঘটে।
৬. ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন : ১৯৪৭ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতা লাভের পর রাষ্ট্রটি উপনিবেশিক মানসিকতা কাটিয়ে জাতীয় ক্রীড়া সংস্কৃতি গড়ে তুলতে বিশেষভাবে উদ্যোগী হয়। সেখানে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে বিশ্বমানের বিভিন্ন ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখান থেকে তৈরি হতে শুরু হয় মানসম্পন্ন বিশ্ব মানের ক্রীড়াবিদ। ফলশ্রুতিতে ভারতে হকি, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, কুস্তিতে বড় অগ্রগতি সাধিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অলিম্পিক সহ আন্তর্জাতিক আসর সমূহে তাদের সাফল্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখিত আলোচনা থেকে পরিষ্কার বুঝা যায় যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া বিপ্লব শুধু সেখানে রাজনৈতিক পরিবর্তনই আনেনি, বরং দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে গণমুখী করেছে, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়িয়েছে, সামাজিক সমতা ও সুযোগ সৃষ্টি করেছে সর্বোপরি জাতীয় পরিচয় ও ঐক্য গঠনে ক্রীড়াকে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার বানিয়েছে। বিপ্লব ক্রীড়ার বিকাশে অনুঘটক হিসেবে সেসব দেশে আবির্ভূত হয়েছে।
সাম্প্রতিক কালে ঘটে যাওয়া বিপ্লব কি আমাদের দেশীয় ক্রীড়ার বিকাশে অনুঘটক হতে পেরেছে কিংবা আমাদেরকে ক্রীড়া ক্ষেত্রে কোনো নুতন আশার আলো দেখাতে পেরেছে? অধিকাংশের মত “না পারেনি”। আর এর দায় সম্পূর্ণভাবে বিগত অন্তবর্তীকালীন অযোগ্য ক্রীড়া প্রশাসনের। সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিত্ব না করায় তাদের অবারিত সুযোগ ছিল বিপ্লবী চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে প্রয়োজনে বিপ্লবী শক্তি প্রয়োগ করে আমাদের ক্রীড়াঙ্গনটাকে অপশক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার, ক্রীড়া কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনার, ব্যক্তি ও সংস্হাগুলোকে স্বৈরাচারী করে তোলার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসা গঠনতন্ত্রগুলো সংশোধন করার, একটা ভালো যুগোপযোগী আধুনিক বাস্তবায়নযোগ্য ক্রীড়া নীতি প্রনয়ন করার, ক্রীড়ার সাথে ক্রীড়া শিক্ষাকে সংযুক্ত করার, ক্রীড়া প্রশাসন সহ এর অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান সমূহে সুশাসন নীতি প্রতিষ্ঠা করার – বিগত দিনের অভিজ্ঞতার আলোকে নির্দ্বিধায় বলতে পারি উল্লিখিত কাজগুলো কোনো রাজনৈতিক সরকারের কাছ থেকে সে অর্থে প্রত্যাশা করা কঠিন। দূর্ভাগ্যজনক হলে ও সত্য যে, বিপ্লব পরবর্তী আমাদের ক্রীড়া প্রশাসন, তার কর্ণধার আর আশেপাশের কিছু দূর্ণীতিপরায়ন ও অযোগ্য লোকদের স্বেচ্ছাচারিতা, সিদ্ধান্ত গ্রহনে অপেশাদারিত্বের, ভূল উদ্যোগ গ্রহন আর স্বজনপ্রীতির কারনে উল্টো আমাদের ক্রীড়াঙ্গনটা লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। যা কাটিয়ে উঠতে আমাদেরকে হয়তো একটি সত্যিকার অর্থে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ ক্রীড়াবান্ধব সৎ ও ন্যায়পরায়ন রাজনৈতিক সরকারকে ক্ষমতায় আসতে হবে নয়তো রুশ বিপ্লব, ফরাসি বিপ্লব, চীনা বিপ্লব কিংবা কিউবান বিপ্লব মানের ও চেতনার আর ও একটা বিপ্লবের জন্য অপেক্ষা করতে হব।
লেখক : সিরাজ উদ্দিন মোঃ আলমগীর, ক্রীড়া সংগঠক ও ক্রীড়া শিক্ষাবিদ।
আপনার মন্তব্য লিখুন