রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০১:৪৬ পূর্বাহ্ন
মুক্তিযোদ্ধা একরামুল করিম:
২১ জুলাই, ২০২৫—বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অপ্রত্যাশিত ও হৃদয়বিদারক দিন। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি এফ-৭ প্রশিক্ষণ বিমান, বহু পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধবিমান, উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে আছড়ে পড়ে। মৃত্যু হয় অন্তত ৩১ জনের, যাদের অধিকাংশই শিশু। শতাধিক শিশু এখনো গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। কিন্তু এই মর্মান্তিক ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়—এ এক পূর্বাভাসিত মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, যা জন্ম নিয়েছে দীর্ঘদিনের অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং অমানবিক ব্যবস্থার ফলস্বরূপ।
বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তাদের এফ-৭ বিমান বহর পরিচালনা করে আসছে—চীনা নির্মিত একটি যুদ্ধবিমান যা মূলত সোভিয়েত যুগের মিগ-২১-এর অনুকরণে তৈরি। এই বিমানগুলো একাধিকবার দুর্ঘটনায় পতিত হয়েছে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশে। কিন্তু আমাদের দেশে এই ঝুঁকিপূর্ণ বিমান দিয়ে এখনও মেধাবী তরুণ পাইলটদের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কেন? কাদের স্বার্থে?
আরও বড় প্রশ্ন—কেন এত জনবহুল রাজধানীর আকাশেই এসব প্রশিক্ষণ চালানো হয়? ঢাকা, যেখানে লক্ষ লক্ষ স্কুলছাত্র-ছাত্রী ও বাসিন্দা রয়েছে, সেই এলাকার মাথার ওপর দিয়ে মৃত্যুবাহী প্রশিক্ষণ বিমান কেন উড়বে?
মাইলস্টোন স্কুল যেখানে অবস্থিত, সেই এলাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যস্ত হয়রত শাহ্ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের সরাসরি ফানেল রুটে পড়ে। কীভাবে এই স্থানে একটি শিশুদের স্কুল স্থাপন অনুমোদন পেল? কে দিল সেই অনুমতি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আমাদের এখনই খুঁজে বের করতে হবে।
দুর্ভাগ্যবশত, দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজ ও চিকিৎসা ব্যবস্থাও ছিল চরম বিশৃঙ্খল। বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত এমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিসের সঠিক কনসেপ্টই ডেভেলপ করেনি। এ নিয়ে পলিসি লেভেলে কোনো কথাও হয় না। অনেক দগ্ধ শিশুদের রিকশা ও মেট্রো রেলগাড়িতে করে হাসপাতালে নেয়া হয়েছে—এটাই কি ২০২৫ সালের রাজধানী ঢাকা শহরের প্রস্তুতি? বার্ন ইনস্টিটিউটে হাহাকার—পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, নেই পর্যাপ্ত ওষুধ বা সরঞ্জাম। তাহলে আমাদের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অবস্থা কী?
এই জাতীয় শোককে কেন্দ্র করে কিছু রাজনৈতিক মহল—বিশেষত অতীত শাসনামলের কিছু অবশিষ্ট অপশক্তি—জনগণের আবেগকে কাজে লাগিয়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট: এই জাতীয় শোককে তারা ক্ষমতালোভী রাজনীতির হাতিয়ার বানাতে চায়। এটা এক চরম নৈতিক অধঃপতন, যা জাতির জন্য আরেকটি বিপদ।
এই মুহূর্তে আমাদের রাজনীতি নয়, দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন। আমাদের একটাই প্রশ্ন হওয়া উচিত: আমরা কেমন জাতি, যারা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে তাদের কাঁধে মৃত্যু নামিয়ে আনি?
আমরা চাই: অবিলম্বে এফ-৭ বিমান বহর স্থায়ীভাবে বাতিল করা হোক; জনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে প্রশিক্ষণ ফ্লাইট বন্ধ করতে হবে; স্কুল, কলেজ, হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যেন বিমান চলাচলের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অনুমোদন না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে; বৃহৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় বার্ন ও ট্রমা চিকিৎসা ব্যবস্থার তাৎক্ষণিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
উত্তরার এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা ব্যর্থ, আমাদের পরিকল্পনাগুলো কতটা বেপরোয়া, আর আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর।
এই শিশুদের রক্ত যেন শেষবারের মতো আমাদের বিবেককে জাগিয়ে তোলে। এই শোক যেন পরিণত হয় জবাবদিহিতার শুরুতে। আর যেন কোনোদিন আকাশ ভেঙে আমাদের সন্তানদের গায়ে না পড়ে।
আপনার মন্তব্য লিখুন