রবিবার, ২৮ জুন ২০২৬, ০৩:১২ পূর্বাহ্ন

সিরাজউদ্দীন মো: আলমগীর:
জীবনের শুরু থেকেই আমি সকলের কাছে মূলত একজন ক্রীড়াবিদ এবং ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেই পরিচিত। শৈশব, কৈশোর কিংবা যৌবনে কখনোই সরাসরি রাজনীতি করিনি, করার ইচ্ছেও কখনো মনে জাগেনি। তৎকালীন আশির দশকে বিএনপির দুর্গ বলে খ্যাত চট্টগ্রাম শহরের আশকারদীঘি পাড় এলাকায় আমার বেড়ে ওঠা এবং ২০০৫ সালে মরহুম আরাফাত রহমান কোকো ভাইয়ের সময়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক হওয়ার কারণে অনেকের কাছেই আমি একজন বিএনপি-পন্থী ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেই ক্রীড়াঙ্গনে পরিচিত হয়ে উঠি। সংগত কারণেই আমি কখনো তা অস্বীকার করিনি বা এড়িয়ে যাইনি।

সরাসরি রাজনীতি না করেও শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শিক সমর্থক হিসেবে পরিচিত থাকার কারণে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আমাকে বিএনপি-পন্থী ট্যাগ ব্যবহার করে চরমভাবে হেনস্তা করা হয়েছে। এই হেনস্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দিদারুল আলম চৌধুরীসহ আরও কয়েকজন। তাঁদের করা একের পর এক অভিযোগের কারণে আমাকে মোট সাতবার দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের মুখোমুখি হতে হয়েছে। একই সময়ে মোকাবিলা করতে হয়েছে এনএসআই, ডিজিএফআই, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, পুলিশ, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়সহ বহু সংস্থার অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদের চাপ।
মহান আল্লাহ সহায় ছিলেন, তিনিই আমাকে রক্ষা করেছেন। এসব অভিযোগ ও হয়রানির বিষয় চট্টগ্রাম ক্রীড়াঙ্গনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকেই তখন জানতেন এবং এখনও জানেন—আলী আব্বাস ভাই, বশর ভাই, শাহাবুদ্দিন শামিম ভাই, হাফিজ ভাইসহ আরও অনেকে। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তৎকালীন কর্মকর্তাদের মধ্যে তাসলিম আপা, আইন কর্মকর্তা কবির ভাই, ইঞ্জিনিয়ার আবেদিন ভাই, জাহেদ এবং বিসিবির সিইও নিজাম উদ্দিন সুজনসহ অনেকেই এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সাক্ষী। চট্টগ্রামের অনেক জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিকরাও বিষয়গুলো সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত ছিলেন। তাঁদের অধিকাংশই আমার ফেসবুকেও যুক্ত আছেন। নিশ্চয়ই তাঁরা আমার এই লেখাটি পড়বেন।
যাঁরা প্রতিহিংসার বিষবাষ্প ছড়িয়ে আমাকে এসব হয়রানির মুখে ফেলেছিলেন, আজ তাঁদের প্রতি আমার সহানুভূতিই জাগে। কারণ হয়তো এখন তাঁদেরকেই মহান আল্লাহর বিচারের মুখে পরিবার-পরিজন ছেড়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তাঁদের করা অভিযোগগুলোর মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাকে যে কী পরিমাণ মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছে, কত রাত নির্ঘুম কাটাতে হয়েছে, কত অজানা আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়তে হয়েছে—তা মহান আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন। আমি শুধু আল্লাহর দরবারে সেজদায় পড়ে তাঁদের বিচার ও হেদায়েত চেয়েছি।

এই সময়কালে চরম হতাশা আর অপদস্ততা থেকে মুক্তি পেতে আমি একাধিকবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করতে চেয়েছি, এমনকি পদত্যাগপত্রও জমা দিয়েছি। কিন্তু আমাকে ভালোবাসার জায়গা থেকে তা গ্রহণ করেননি তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার জনাব সিরাজুল হক খান সাহেব। তাঁর যুক্তি ছিল, আমার বিরুদ্ধে চলমান অভিযোগগুলো আমি পদে থেকে যেভাবে মোকাবিলা করতে পারব এবং প্রয়োজনীয় অফিসিয়াল নথিপত্র সরবরাহ করতে পারব, পদত্যাগ করলে নতুন কারো উপস্থিতি আমাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। বিষয়টি উপলব্ধি করে আমি পদে বহাল থেকেই দায়িত্ব চালিয়ে যাই। আমার দুর্দিনে জনাব সিরাজুল হক খান সাহেবের এই দূরদর্শী ও মানবিক পরামর্শের জন্য আমি তাঁর কাছে আজীবন ঋণী।
৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে আমার অনেক শুভানুধ্যায়ী আমাকে ঐসব রাজনৈতিক দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাধ্যমে যৌক্তিক অভিযোগ দায়ের করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু মহান আল্লাহ আমাকে সবর দান করেছেন, আমাকে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠতে দেননি।

জানি না আজ তাঁরাও সে সময়ের আমার মতো একই ধরনের মানসিক যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন কি না। তবে তৎকালীন চট্টগ্রাম বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার জনাব আলেফ উদ্দিন একদিন আমার এই দীর্ঘ হয়রানি ও চরম হতাশা দেখে আমার মোবাইলে একটি ক্ষুদে বার্তা পাঠিয়েছিলেন—
“Wait for the divine justice.”
যদি সত্যিই এটি ডিভাইন জাস্টিস হয়ে থাকে, তবে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি বিনীত অনুরোধ—দয়া করে কারও বিরুদ্ধে বিষবাষ্প ছড়াবেন না, কারও মানসিক যন্ত্রণা বা হয়রানির কারণ হবেন না। কারণ প্রকৃতির প্রতিশোধ বড়ই নির্মম এবং অবশ্যম্ভাবী।
আমি আমার ক্রীড়া সাংগঠনিক জীবনে দুই দফা বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের পরিচালক এবং বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। এক যুগেরও বেশি সময় চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। ইসলামিক স্পোর্টস সলিডারিটি কমিটির বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের সুযোগও পেয়েছি। বাংলাদেশে টি–২০ ক্রিকেটের পথচলা আমার হাত ধরেই শুরু হওয়ায় বিপিএল টি–২০ ক্রিকেটের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হওয়ার সৌভাগ্যও আমার হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডসহ বিভিন্ন ক্রীড়া ফেডারেশনের গঠনতন্ত্র সংশোধনীতে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। ইসলামিক সলিডারিটি গেমসে বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টের চীফ দা মিশনের দায়িত্ব পালনের সুযোগ ছিল আমার জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি।
মহান আল্লাহ যে অবারিত সুযোগগুলো আমাকে দিয়েছেন, সেসবের জন্য রবের দরবারে লাখো কোটি শুকরিয়া আদায় করছি। আল্লাহর নামে শপথ করে বলছি—আমার কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নেই। ক্রীড়াঙ্গন থেকে একজন সংগঠক হিসেবে আমার আর তেমন কোনো চাওয়া-পাওয়াও অবশিষ্ট নেই। আমি আমার জীবনের বাকিটা সময় মহান আল্লাহর শুকরিয়া আদায় এবং তাঁর সান্নিধ্য লাভের কাজেই ব্যয় করতে চাই। পাশাপাশি অবসর সময়ে আমার লব্ধ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ক্রীড়া ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও যুগোপযোগী ক্রীড়া নীতি প্রণয়নে একটি স্বতন্ত্র প্ল্যাটফর্ম থেকে নিজের মতো করে কাজ করার ইচ্ছা রাখি।
মোবাইল ফোনে পুরোনো কিছু ছবি খুঁজতে গিয়ে নিচে সংযুক্ত সর্বশেষ অভিযোগের একটি স্ক্রিনশট নজরে আসে। আবেগতাড়িত হয়েই বিষয়টি তুলে ধরলাম।
আল্লাহ আমাদের সবার মঙ্গল করুন।
আপনার মন্তব্য লিখুন